চিকিৎসকদের বিদেশে প্রশিক্ষণ উপেক্ষিত কেন?
খোলামত
এ বি এম কামরুল হাসানআমি এনেস্থেসিয়ার ডাক্তার। মূর্খরা বলে অজ্ঞানের ডাক্তার। মূর্খই তো। আমি শুধু রোগীর জ্ঞান হারানোর কাজ করি না। অনেকে বলে অবেদনবিদ। আমি শুধু বেদনা নিবারণের কাজ করি না। মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসাও করি। অপারেশনের সময় ঘুম পড়ানো, জাগানো, ব্যথা নিবারণ, স্বাভাবিক সময়ের মত রোগীর সব শারীরিক কার্যক্রম ঠিক রাখা, কখনো কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে বা প্রয়োজনমাফিক রোগীর রিদস্পন্দন-রক্তচাপ বাড়ানো-কমানো- এ সবই আমার কাজ। তাই একটি শব্দে আমাকে অজ্ঞানের ডাক্তার বা অবেদিনবিদ বলা মূর্খতারই পরিচয়। আসলে সব ইংরেজি শব্দের বাংলা হয় না। যেমন টেবিলের কোন বাংলা নেই, যেমন নেই কর্নেল বা লেফটেন্যান্ট শব্দের। অপারেশনের সময়ে ও তার আগে-পরে রোগীর দায় দায়িত্ব আমার ওপর থাকে বলেই আজকাল দুনিয়া জুড়ে আমার বিষয়টিকে বলা হচ্ছে পেরি অপারেটিভ মেডিসিন।
এনেস্থেসিয়া বা পেরি অপারেটিভ মেডিসিন আমাদের শাস্ত্রে দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি বিভাগ। পঁচিশ বছর আগে যখন আমি এ জগতে প্রবেশ করি তখন যে কলা কৌশল, যন্ত্রপাতি বা ওষুধ ব্যবহার করতাম তার অনেক কিছুই এখন অতীত, জাদুঘরে রাখার মতো। আজ আমার দৈনন্দিন কাজকর্মে আল্ট্রাসনোগ্রাম নিত্যসঙ্গী। নির্ভুলভাবে রোগীর কোন একটি নার্ভকে ব্লক করে শরীরের কোন একটি অংশ অবশ করে অপারেশন উপযোগী করা, যে রোগীর নাড়ি খালি চোখে দেখা যায় না তাঁকে কোনো ইনজেকশন বা সেলাইন দেয়া, অপারেশন পরবর্তী সময়ে অপারেশনস্থল ব্যথামুক্ত রাখা- এগুলোর জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। ২০১৩ সালে আমি যখন আই সি ইউ চিকিৎসকদের জন্য আয়োজিত ওয়ার্ল্ড আল্ট্রাসনোগ্রাম কংগ্রেসে হংকং যাই, তখন অনেকে হাসাহাসি করেছিল। অজ্ঞানের ডাক্তারের আবার আল্ট্রাসনোগ্রাম কেন! কিন্তু আজ এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তবে সেটা দেশে নয়, বিদেশে। খোঁজ নিয়ে যতদূর জেনেছি, দেশে এর ব্যবহার রয়েছে ঢাকার প্রথম শ্রেণীর কতিপয় কর্পোরেট হাসপাতালে। সরকারি পর্যায়ে এনেস্থেসিয়া বিভাগে আল্ট্রাসনোগ্রাম রয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও নবনির্মিত শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে।
বস্তুত, চিকিৎসা বিজ্ঞানের সব বিভাগেই এমন নতুন নতুন যন্ত্রপাতি, কলাকৌশল বিশ্বব্যাপী চালু হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, দ্রুত পরিবর্তনশীল চিকিৎসা বিজ্ঞানের এ যুগে এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য গত দশ বা বিশ বছরে কতজনকে বিদেশে পাঠিয়েছেন? মনে পড়ে, শেষ কবে কোন চিকিৎসককে ইউরোপ, আমেরিকা বা নিদেনপক্ষে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডে পাঠিয়েছেন কোন নতুন কলা কৌশলের প্রশিক্ষণ নিতে? যতদূর জানি, দেশের চিকিৎসকরা নিজ উদ্যোগে, নিজ খরচে, নিজ ছুটি ব্যয় করে এসব বিষয়ে বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
পত্রিকার পাতা খুললেই দেখি কত পদের বৈদেশিক প্রশিক্ষণ ও ভ্রমণ। পুকুর কাটা, পুকুর ভরাট করা, বিল্ডিং দেখা, খিচুড়ি বা মিড্ ডে মিল রান্না শেখা বা সার্বিক ব্যবস্থাপনা শেখা, লিফট কিনতে যাওয়া, ক্যামেরা কিনতে যাওয়া -আরো কত কি। অথচ কখনো শুনি না, পাঁচ বা দশ জন চিকিৎসককে পাঠানো হচ্ছে চিকিৎসা বিজ্ঞানের নতুন কোন কৌশল শিখতে। কোন এনেস্থেটিস্ট যদি আল্ট্রাসনোগ্রাম বিষয়ে বিদেশ থেকে শিখে আসেন, তাতে তার কোনো লাভ হবে না, হবে ভোক্তাদের মানে আপনার আমার। এই 'আপনি'র ভেতর তিনিও আছেন, যারা পত্রিকায় প্রকাশিত বৈদেশিক প্রশিক্ষণগুলোর প্রকল্প ও বাজেট প্রণয়ন, যাচাই বাছাই বা শেষ পর্যন্ত সম্মতি দিচ্ছেন। অনেক সময় দেখা গেছে, কোন একজন হয়তো পুকুর কাটা শিখে আসার পরদিন মুক্তিযোদ্ধা বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বদলি হলেন বা অবসরে গেলেন। কোন চিকিৎসক যদি একটি বিষয়ে শিখে আসেন, তিনি আসার পরও সমগ্র চাকুরীজীবনে ওই বিভাগেই থাকবেন। তাঁর প্রশিক্ষণ থেকে ভোক্তারা মানে রোগীরা আজীবন সুবিধা পাবেন। চিকিৎসকদের নতুন নতুন কলা কৌশল শিখতে বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারটা যুগ যুগ ধরে উপেক্ষিত। অথচ এই আমরাই সরকারি হাসপাতালে যেয়ে বিশ্বমানের চিকিৎসা খুঁজি।
কোভিড মহামারি থেকে আমরা যা কিছু শিখেছি ۔ তার অন্যতম হল ‘দেশি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে হও ধন্য’। চাইলেই আজ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যেতে পারছেন না। ভবিষ্যতে যে এমনটি আবার হবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা কি আছে? তাই আজ ভাবার সময় এসেছে দেশি হাসপাতালগুলোকে যুগোপযোগী করার- প্রযুক্তি ও কর্মদক্ষতায়। আমাদের চিকিৎসকরা পারে বিশ্বমানের সেবা দিতে। দেশি মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করে ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশেই আমাদের ছেলেরা বিশ্বমানের সেবা দিচ্ছে। শুধু প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা, যুগোপযোগী কর্মপরিকল্পনা, নতুন কলাকৌশলের প্রশিক্ষণ ও সর্বোপরি দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্য প্রশাসন।
লেখকঃ ব্রুনাই প্রবাসী চিকিৎসক, কলামিস্ট
পূর্বপশ্চিমবিডি/এসএম
Post Written by :
Original Post URL : https://ppbd.news/open-views/174485/চিকিৎসকদের-বিদেশে-প্রশিক্ষণ-উপেক্ষিত-কেন?
Post Come trough : PURBOPOSHCIMBD